বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোপালগঞ্জ শহরের বেদগ্রাম এলাকায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন— পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার কলারদোনিয়া গ্রামের আবু হানিফের ছেলে মো. সোহাগ (৩৬), তার স্ত্রী খাদিজা খাতুন (৩০), তাদের ছেলে মো. আরমান (৬), মোটরসাইকেল চালক বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার বড়বাড়িয়া গ্রামের শাওন ঢালী (২২) এবং একই গ্রামের মাহাবুব শেখের ছেলে ও চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থী সোয়েব শেখ (১৬)।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন অঞ্জনা সিকদার (৩৫), পূর্ণিমা (২৫), মিন্টু (৪০), তামান্না (২২), ফেরদৌস (২৫), রনি (২৩), মনির (৫৫), শান্তা (২১), সাদিয়া (২৭), সজিব (২৫) ও হৃদয় (৩০)। তাদের গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন আহত ব্যক্তি গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে গোপালগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর, জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান এবং পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন, আহতদের সঙ্গে কথা বলেন এবং উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।
গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ জানান, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পিরোজপুরগামী দোলা পরিবহনের একটি বাস বেদগ্রাম এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বেপরোয়া মোটরসাইকেলের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেলটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের ওপর উল্টে পড়ে।
তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থলেই মোটরসাইকেলের দুই আরোহীসহ চারজন নিহত হন। আহতদের উদ্ধার করে গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে ৬ বছরের শিশু আরমানের মৃত্যু হয়। আহতদের মধ্যে ১১ জনকে গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
পুলিশ সুপারের ভাষ্য, বেপরোয়া গতি ও মাত্রাতিরিক্ত ওভারটেকিংয়ের কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
বাসযাত্রী আহত মোহাম্মদ জামাল শিকদার বলেন, “আমি বাসের মাঝামাঝি সিটে বসেছিলাম। বাসটি ঢাকা থেকে পিরোজপুর যাচ্ছিল। বেদগ্রাম এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগতির মোটরসাইকেল ঢেউ দিয়ে বাসের নিচে ঢুকে পড়ে। এতে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে বাসটি সড়কের ওপর উল্টে যায়। বাসে প্রায় ৩৫ জন যাত্রী ছিল। সবাই কমবেশি আহত হয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “এই সড়কটি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি রোধে পুলিশ ও প্রশাসনের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”
গোপালগঞ্জ সদর আসনের এমপি ডা. কে এম বাবর বলেন, “দুর্ঘটনাপ্রবণ এই সড়ককে নিরাপদ করতে আমরা কাজ করব। পুলিশ, সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রশাসনের সমন্বয়ে সভা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি রোধে যা যা করা দরকার, তা করা হবে।”
তিনি জানান, দুর্ঘটনার পর প্রায় ৩০ মিনিট ওই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে রেকার দিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি সরিয়ে নেওয়ার পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
ভাটিয়াপাড়া হাইওয়ে থানার এসআই নৃপেন কুমার দাস জানান, নিহত পাঁচজনের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল চত্বরে সম্পন্ন করা হয়েছে। সন্ধ্যা ৬টার দিকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের কার্যক্রম চলছিল।
নিহত সোয়েব শেখের বন্ধু সাহারুল ইসলাম জানান, সোয়েব ও শাওন মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি গ্রামে মহামানব গনেশ পাগলের কুম্ভমেলায় যাচ্ছিলেন। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে তারা বড়বাড়িয়া গ্রাম থেকে মোটরসাইকেলে রওনা দেন। বেদগ্রাম এলাকায় পৌঁছালে বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে তাদের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
তিনি জানান, সোয়েব চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল।
এদিকে বিকেল ৫টার পর গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে এসে নিহত গৃহবধূ খাদিজা খাতুনের মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা মো. খালেক (৬০) ও ভাই মেহেদী হাসান (৩২)। তাদের আহাজারিতে হাসপাতাল চত্বরে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মো. খালেক বলেন, “একই গ্রামের সোহাগের সঙ্গে ১৬ বছর আগে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম। তাদের দুই ছেলে। বড় ছেলে রহমতউল্লাহ (১৪) আমার কাছে থেকে পড়াশোনা করে। ছোট ছেলে আরমান বাবা-মায়ের সঙ্গে ঢাকায় থাকত।”
তিনি জানান, সোহাগ পোস্তগোলায় কাঠের আড়তে ট্রাকে কাঠ লোড-আনলোডের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। ঈদ উপলক্ষে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন তারা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বেলা ১১টার দিকে শেষবার তাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তখন তারা ভাঙ্গা পৌঁছেছিল। এরপর অনেকবার ফোন দিয়েছি, কিন্তু আর ধরেনি। পরে মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে এসেছি। আমার মেয়ে-জামাই-নাতির সংসার একসঙ্গে শেষ হয়ে গেল। বড় নাতি রহমতউল্লাহ এতিম হয়ে গেল। আমি এই মৃত্যু সহ্য করতে পারছি না।”
এ কথা বলতে বলতেই তিনি কখনও লাশের পাশে গড়াগড়ি করছিলেন, আবার কখনও আহাজারি করছিলেন। তার সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য উপস্থিত সবার চোখে জল এনে দেয়।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...