Logo Logo

অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে দেশি খেজুর, খাচ্ছে পশুপাখি


Splash Image

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সড়কের পাশে, বাড়ির আঙিনায়, ফসলি জমির আইলে, পুকুরপাড়ে ও পতিত জমিতে এখনও সারি সারি দেশি খেজুর গাছের দেখা মেলে। বর্ষা মৌসুমে এসব গাছে থোকায় থোকায় খেজুর ধরলেও আধুনিক মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ায় অধিকাংশ ফল এখন গাছেই পচে নষ্ট হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন


স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় গ্রামীণ জনপদে দেশি খেজুর সাধারণ মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। স্থানীয় হাট-বাজারেও এই ফলের ব্যাপক কেনাবেচা হতো। অনেকে কাঁচা খেজুর পেড়ে এনে লবণ-পানিতে কয়েক দিন রেখে পাকিয়ে খেতেন। মুখরোচক ও পুষ্টিকর এই দেশীয় ফলের কদর একসময় ব্যাপক থাকলেও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতি মানুষের আগ্রহ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ফলে গাছের অধিকাংশ ফল এখন মূলত পাখির খাদ্যে পরিণত হচ্ছে।

সদর উপজেলার তুতবাটি গ্রামের অটোরিকশাচালক ভুলু মোল্লা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে দেশি খেজুর মূলত পশুপাখির খাবারে পরিণত হয়েছে, মানুষ এখন আর খুব একটা খায় না। অথচ একসময় আমরা বাজার থেকে নিয়মিত কিনে এনে এই ফল খেয়েছি। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট প্রতিটি ফলেরই আলাদা পুষ্টিগুণ রয়েছে। আমাদের উচিত এই দেশি ফল খাওয়ার পুরনো অভ্যাস আবার গড়ে তোলা।

পৌরসভার নবীনবাগ এলাকার বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন সুজা তাঁর স্মৃতিচারণ করে বলেন, ছোটবেলায় গাছ থেকে পেড়ে অনেক খেজুর খেয়েছি। তখন মাটির কলসিতে লবণ-পানিতে দুই-তিন দিন রেখে খেজুর পাকিয়ে খাওয়ার দারুণ এক প্রচলন ছিল। কিন্তু এখনকার নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে সেই আগ্রহ আর একেবারেই দেখা যায় না। আমরা আধুনিক হতে গিয়ে ধীরে ধীরে আমাদের দেশি ফলগুলো ভুলে যাচ্ছি।

একই অভিমত ব্যক্ত করে স্থানীয় বাসিন্দা সোহাগ সিকদার, রহিম মিয়া, পলাশ কাজী, সোহেল মোল্লা ও বনিউল আলম সবুজ বলেন, আগে ছোট-বড় সব শ্রেণির মানুষই অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে দেশি খেজুর খেত। বর্তমানে দেশের বাজারে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের বিদেশি খেজুর সারা বছর সহজলভ্য হওয়ায় দেশি খেজুরের চাহিদা তলানিতে ঠেকেছে। বিদেশি খেজুর আকারে বড় ও দেখতে আকর্ষণীয় হলেও, দেশি খেজুরের অনন্য স্বাদ ও পুষ্টিগুণের কারণে একসময় এর কদর অনেক বেশি ছিল।

ঐতিহ্যবাহী খেজুরের গুড় প্রস্তুতকারী গাছি অরুণ ধাবক জানান, তিনি প্রতি শীত মৌসুমে প্রায় ৩০০টি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করেন। বর্তমানে তাঁর চুক্তিবদ্ধ গাছগুলোতে প্রচুর খেজুর ধরলেও তিনি বা জমির মালিকরা সেগুলো সংগ্রহ করেন না। তিনি বলেন, সব ফল আমি পাখিদের জন্য ছেড়ে দিয়েছি। প্রতিদিন শত শত শালিক, বুলবুলি ও বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় পাখি এসে এই খেজুর খায়। তাদের কিচিরমিচির শুনতে খুবই ভালো লাগে।

মিয়া বাড়ির বাসিন্দা পলাশ শিকদার বলেন, দেশি খেজুরসহ অন্যান্য সব মৌসুমি দেশি ফল স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এসব প্রাকৃতিক ফলে প্রচুর ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে। তাই কৃত্রিম বা বিদেশি ফলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশি ফল খাওয়ার অভ্যাস বাড়ানোর পাশাপাশি এসব গাছ সংরক্ষণে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দেশীয় ফলের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়াতে এবং নতুন প্রজন্মকে দেশি ফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিশেষ সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া এখন জরুরি। তা না হলে একসময় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই ফলটি মানুষের জীবন ও গ্রামীণ ঐতিহ্য থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...