বিজ্ঞাপন
গোপালগঞ্জ জেলায় গত ২-৩ বছর ধরে ভাঙন প্রতিরোধে কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। ফলে নতুন বাঁধ নির্মাণ ও বিদ্যমান বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যা নদীভাঙন বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যয়ের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায় মধুমতি নদীর শাখা নদীর তীরবর্তী ১৩টি স্থানে, কাশিয়ানী উপজেলায় মধুমতি ও কুমার নদসহ শাখা নদীর তীরবর্তী ১৯টি স্থানে, টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় মধুমতি ও বাঘিয়ার নদীসহ শাখা নদীর তীরবর্তী ৯টি স্থানে এবং কোটালীপাড়া উপজেলায় ১টি স্থানে পাড় ও বাঁধে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। সরজমিনে দেখা গেছে, নদী তীরবর্তী বেশ কিছু পরিবার ইতিমধ্যে বাস্তুচ্যুত হওয়ার সম্মুখীন। এছাড়া বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় ও সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অবকাঠামো এখন বিলীনের মুখে।
গোপালগঞ্জের এই নদীভাঙন পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান মোল্লা, গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর এবং গোপালগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জিলানী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা নদীভাঙন রোধ, তীরবর্তী জনদুর্ভোগ লাঘব এবং অবকাঠামো রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন।
গোপালগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর বলেন, গোপালগঞ্জ-২ আসনের মধুমতী তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। তাৎক্ষণিক ভাঙন ঠেকাতে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্টদের ব্লক ও জিওব্যাগের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষের বসতবাড়ি ও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষতি এড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আবারও যোগাযোগ করা হবে।
ভাঙনের ভয়াবহতা তুলে ধরে গোপালগঞ্জ সদরের মধুমতি পাড়ের মানিকহার গ্রামের চরপাড়ার বাসিন্দা হেদায়েতুল ইসলাম খান (৬৮) জানান, ২০০০ সালে তিনি নিরাপদ জায়গায় বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তার বিপুল পরিমাণ জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এবং এখন বসত বাড়িটিও ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সরকারিভাবে কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নেওয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাদের এলাকায় এখন পর্যন্ত একটি বালুর বস্তাও ফেলা হয়নি। ভাঙনের কারণে আশপাশের অনেক পরিবার আগেই ঘরবাড়ি ও জমি হারিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।
একইভাবে টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতি ইউনিয়নের গিমাডাঙ্গা গ্রামের বাঘিয়ার নদী তীরবর্তী গজালিয়া এলাকার বাসিন্দা মোঃ কামরুল শেখ (৫৫) জানান, প্রায় ৫ বছর আগে সেখানে একটি বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নদী এখন প্রায় ১০ থেকে ১২ হাত ভেতরের দিকে ভেঙে চলে এসেছে। তার বসতঘর থেকে মাত্র ৪ থেকে ৫ হাত দূরে ভাঙন অবস্থান করছে। ওই এলাকায় বসবাসকারী ১৫ থেকে ২০টি পরিবার বর্তমানে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
ওই এলাকার অপর বাসিন্দা মোঃ শুকুর আলী শেখ (৫২) জানান, এলাকায় যাতায়াতের একমাত্র রাস্তাটি নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে মাটি দিয়ে অস্থায়ীভাবে রাস্তা তৈরি করে মাদ্রাসা, স্কুল ও মসজিদে যাতায়াত করছেন। রাস্তার সাথেই তার বসতবাড়ি হওয়ায় তিনি চরম আতঙ্কে আছেন এবং এখনই ব্যবস্থা না নিলে চলতি বর্ষায় অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা করছেন।
গোপালগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনিস হায়দার খান জানান, জেলায় বর্তমানে ৪২টি নদীভাঙন প্রবণ গুরুত্বপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যরাও এসব এলাকার বিষয়ে লিখিতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ড কয়েকটি স্থানে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের আওতায় কাজের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দ্রুত জিওব্যাগ বা ব্লক ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে আপৎকালীন ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকার প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হবে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অর্থায়ন নিশ্চিত হলে চলতি বছর নদীভাঙনের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...