Logo Logo

বিষখালী নদীর পেটে যাচ্ছে নলছিটির ৪টি বিদ্যালয়, আতঙ্কে সাত শতাধিক শিক্ষার্থী


Splash Image

ঝালকাঠির নলছিটিতে বিষখালী নদীর ভয়াবহ ভাঙনে হুমকির মুখে পড়েছে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিদ্যালয়গুলো হলো— নাচনমহল ইউনিয়নের ভবানীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পাশের রানাপাশা ইউনিয়নের হদুয়া গ্রামের ইসলামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বিদ্যালয়গুলোর খেলার মাঠের বড় একটি অংশ। জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে শ্রেণিকক্ষ ও বিদ্যালয়ের মাঠ। নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা জরাজীর্ণ ভবনগুলোর ছাদ ও দেয়াল থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা, কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে ফাটল। চরম ঝুঁকি নিয়ে এসব বিদ্যালয়ে চলছে পাঠদান। ফলে আতঙ্কে রয়েছেন চারটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় সাত শতাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা।


বিজ্ঞাপন


স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে বিষখালী নদীর ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করলেও বিদ্যালয়গুলো রক্ষায় এখনো টেকসই কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দ্রুত বিদ্যালয়গুলো অন্যত্র সরিয়ে নতুন ভবন নির্মাণ এবং নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়রা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার নাচনমহল ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের বিষখালী নদীর তীব্র ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ভবানীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং একই আঙিনায় থাকা ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গত দুই থেকে তিন মাসে নদীভাঙন বিদ্যালয় দুটির প্রায় ১০০ গজের মধ্যে চলে এসেছে। নদীর পাড়ের খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছে বিদ্যালয়ের ভবন। জোয়ারের সময় নদীর পানি মাঠে উঠে আসে এবং ঢেউ আছড়ে পড়ে বিদ্যালয় ভবনের কাছাকাছি। দুই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ৪৫০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। নদীভাঙনে ইতোমধ্যে বিদ্যালয় দুটির খেলার মাঠের বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একটি বেড়িবাঁধ ছিল, সেটিও গত ১৫ আগস্টের ভয়াবহ ভাঙনে বিদ্যালয়ের মাঠের একাংশসহ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে নদী ও বিদ্যালয়ের মধ্যে এখন কার্যত কোনো নিরাপদ দূরত্ব নেই। বিদ্যালয় দুটির পুরোনো ভবনও জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং ছাদ থেকে প্রায়ই পলেস্তারা খসে পড়ছে। নদীভাঙনের আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের অন্যত্র ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন। এতে দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে।

ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনমথ রঞ্জন সমাদ্দার বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৯০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। নদী ভাঙতে ভাঙতে এখন বিদ্যালয় ভবনের একেবারে কাছে চলে এসেছে। ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমরা সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি—কখন কোন অঘটন ঘটে যায় বলা যায় না। বেড়িবাঁধ নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় বাচ্চারা অসাবধানতাবশত নদীর দিকে চলে যায়। আবার জোয়ারের সময় বিদ্যালয়ের মাঠ পানিতে থইথই করে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, যে হারে ভাঙন এগিয়ে আসছে, তাতে যেকোনো সময় বিদ্যালয় ভবন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। বিদ্যালয়টি দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি।”

ভবানীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “বিষখালী নদীর ভয়াবহ ভাঙন আগের বছরগুলোর তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। গত তিন মাসে ভাঙন বিদ্যালয়ের ১০০ গজের মধ্যে চলে এসেছে। গত ১৫ আগস্টের ভাঙনে বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের একাংশসহ বেড়িবাঁধ নদীতে বিলীন হয়েছে। এভাবে ভাঙন অব্যাহত থাকলে আগামী এক-দুই মাসের মধ্যেই অবশিষ্ট মাঠটুকুও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। এরপর বিদ্যালয় ভবনও নিরাপদ থাকবে না। তাই শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে দ্রুত বিদ্যালয়টি অন্যত্র সরিয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন।”

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুন্নি আক্তার ও হাসানুজ্জামান বলেন, “একসময় আমাদের বিদ্যালয়ে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু নদীভাঙনের কারণে বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। বর্তমানে সব শ্রেণি মিলিয়ে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। বিষখালীর প্রবল ভাঙন এখন বিদ্যালয়ের খুব কাছাকাছি। বিদ্যালয়ের মাঠের একাংশ নদীতে চলে গেছে। জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অবশিষ্ট মাঠ এবং বিদ্যালয় ভবনও নদীর গর্ভে যেতে সময় লাগবে না।”

অন্যদিকে, উপজেলার পাশের রানাপাশা ইউনিয়নের হদুয়া গ্রামে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও একইভাবে নদীভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। দুই প্রতিষ্ঠানে রয়েছে প্রায় ২৮০ জন শিক্ষার্থী। জরাজীর্ণ ভবনে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, নেই শিক্ষকদের বসার পর্যাপ্ত জায়গাও। জোয়ার এলেই বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ও মাঠ পানিতে তলিয়ে যায়। এতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষকদের দাবি, ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে শিক্ষার্থীদের আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সবসময় আতঙ্ক বিরাজ করছে। পাঁচ বছর আগেও বিষখালী নদী বিদ্যালয় থেকে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ গজ দূরে ছিল। কিন্তু গত ছয় মাসে ভয়াবহ ভাঙনে নদী বিদ্যালয় থেকে মাত্র দেড় শত গজের মধ্যে চলে এসেছে।

ইসলামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খলিলুর রহমান বলেন, “আমার বিদ্যালয়টি বছরের প্রায় ছয় মাস পানিবন্দি থাকে। জরাজীর্ণ ভবনে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই। ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমাদের সবসময় শঙ্কার মধ্যে থাকতে হয়। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ফলে আশঙ্কাজনক হারে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যাচ্ছে। গত তিন-চার মাসে বিষখালী নদীর ভাঙন আমার বিদ্যালয়ের মাত্র ১৫০ গজের মধ্যে চলে এসেছে। দ্রুত নদীভাঙন রোধ ও বিদ্যালয়টি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ না নিলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।”

শিক্ষার্থী ও অভিভাবক শারমিন আক্তার, রুবিনা বেগম ও সালমা আক্তার বলেন, “ভাঙনকবলিত বিদ্যালয়ে ছোট ছোট সন্তানদের পাঠিয়ে আমরা প্রতিদিন দুশ্চিন্তায় থাকি। কখন নদী বিদ্যালয়ের আরও কাছে চলে আসে, কখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে—এই ভয় সবসময় কাজ করে। বিদ্যালয়ের নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় ভালো শিক্ষকও এখানে এসে থাকতে চান না। সরকার দ্রুত বিদ্যালয়গুলো রক্ষা কিংবা নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করলে আমরা স্বস্তি পাব।”

স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবক শাহিন হাওলাদারসহ কয়েকজন বলেন, “বিষখালী নদীর ভাঙনে এরই মধ্যে এই এলাকার বহু মানুষ ভূমিহীন হয়েছেন। এই বর্ষায় ভাঙন আরও ভয়াবহ হয়েছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো পরিবারের বাড়িঘর, কৃষিজমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। আমাদের সন্তানরা এসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। এখন বিদ্যালয়ও ভাঙনের ঝুঁকিতে। বিদ্যালয়গুলো নদীতে বিলীন হয়ে গেলে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত নদীভাঙন রোধে কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

মোল্লারহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম বলেন, “দুই ইউনিয়নের এই চারটি বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। দুর্গম এই এলাকার শিক্ষা বিস্তারে বিদ্যালয়গুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু গত দুই বছরে নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করায় বিদ্যালয়গুলো নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। চারটি বিদ্যালয়কে রক্ষা করা শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষার বিষয় নয়, এটি পুরো এলাকার শিক্ষাব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার বিষয়। দ্রুত নদীভাঙন ঠেকাতে হবে এবং প্রয়োজন হলে বিদ্যালয়গুলো নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করে নতুন ভবন নির্মাণ করতে হবে।”

নলছিটি উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার বদরুল আমিন বলেন, “ভাঙনে বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিদ্যালয়গুলো রক্ষায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।”

এদিকে, ভাঙনকবলিত ভবানীপুর এলাকা ও বিদ্যালয় দুটি পরিদর্শন করেছেন ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো। স্থানীয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে ভাঙনের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেন তিনি।

নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রতীক কুমার কুন্ডু বলেন, “ভাঙনকবলিত বিদ্যালয়গুলো আমি এবং ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো মহোদয় পরিদর্শন করে এসেছি। বিদ্যালয়গুলোর বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মাধ্যমিক শিক্ষা দপ্তরের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে আমরা একযোগে কাজ শুরু করেছি। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। আশা করছি, অচিরেই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।”

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে শুধু চারটি বিদ্যালয় নয়, আশপাশের বসতবাড়ি, কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও অন্যান্য স্থাপনাও একে একে বিষখালী নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও তাদের শিক্ষাজীবন। তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দ্রুত টেকসই নদীভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে বিদ্যালয়গুলো নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করে নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপন

আরো দেখুন


বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সংবাদ লোড হচ্ছে...